ভূমিকা
যেকোনো চাকরির ইন্টারভিউতেই প্রথম প্রশ্নটি প্রায়ই হয়:
“আপনি নিজেকে সম্পর্কে কিছু বলুন” (Tell me about yourself)
এই প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও, এটি আপনার ইন্টারভিউয়ের ধরণ নির্ধারণ করতে পারে। আপনি যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, সংক্ষেপে এবং প্রাসঙ্গিকভাবে উত্তর দিতে পারেন, তাহলে ইন্টারভিউয়ারের মনে ভালো প্রভাব ফেলা যায়।
এই আর্টিকেলে আমরা জানবো:
- কেন ইন্টারভিউয়ার এই প্রশ্নটি করে
- কীভাবে গঠনমূলক উত্তর দিতে হয়
- কী কী ভুল এড়িয়ে চলতে হবে
- এবং কিছু বাস্তব উদাহরণ
কেন এই প্রশ্নটি করা হয়?
এই প্রশ্নের মাধ্যমে ইন্টারভিউয়ার মূলত জানতে চান:
- আপনি নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করেন
- আপনি চাকরির জন্য কতটা প্রস্তুত
- আপনার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কীভাবে এই পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
- আপনার যোগাযোগ দক্ষতা কেমন
এটি এমন এক সুযোগ যেখানে আপনি নিজের পেশাগত প্রোফাইল সংক্ষেপে তুলে ধরতে পারেন।
কিভাবে উত্তর দেবেন?
Step 1: সংক্ষেপে আপনার পরিচয় দিন
- আপনার নাম, বর্তমান পদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা
“আমি মাহফুজ রহমান, বর্তমানে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছি।”
Step 2: প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা বলুন
- আগের চাকরি বা শিক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উল্লেখ করুন
“আমি গত ৩ বছর ধরে ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে কাজ করছি এবং JavaScript ও React-এর উপর ভালো দখল রয়েছে।”
Step 3: কেন এই চাকরিটা আপনার জন্য উপযুক্ত তা ব্যাখ্যা করুন
- কীভাবে আপনার দক্ষতা এই পদের জন্য প্রাসঙ্গিক
“আমি নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী এবং বিশ্বাস করি আপনার প্রতিষ্ঠানে আমি আরও দক্ষতা অর্জন করতে পারব।”
কী কী ভুল এড়িয়ে চলবেন?
1. অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা
ভুল উদাহরণ:
“আমি দুই ভাই এক বোন, আমার শখ গান শোনা, ঘুরতে যাওয়া। আমার পছন্দের খাবার বিরিয়ানি।“
সঠিক নয় কারণ:
এই প্রশ্নটি পেশাগত প্রেক্ষাপটে করা হয়। ব্যক্তিগত তথ্য বা শখের বিষয় পরে বলা যেতে পারে, তবে শুরুতেই তা বলা প্রাসঙ্গিক নয়।
2. অপ্রসঙ্গিক বা এলোমেলোভাবে কথা বলা
ভুল উদাহরণ:
“আমি অনার্স করেছি, তারপর একটা কোর্স করেছি, তারপর একটু চাকরি খুঁজছিলাম, পরে এক আত্মীয় বলল এই প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে…”
সঠিক নয় কারণ:
এভাবে অগোছালোভাবে বললে ইন্টারভিউয়ার আপনার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাবেন না। সংক্ষিপ্ত, নির্ভুল এবং ধারাবাহিকভাবে বলা উচিত।
3. অতি আত্মবিশ্বাস বা আত্মপ্রশংসা করা
ভুল উদাহরণ:
“আমি সব ধরনের কাজেই সেরা। আমার চেয়ে ভালো কেউ হবে না।“
সঠিক নয় কারণ:
অতি আত্মবিশ্বাস আপনাকে অহংকারী হিসেবে তুলে ধরতে পারে। নিজের দক্ষতা উল্লেখ করুন, তবে নম্রভাবে।
4. লম্বা ও বিরক্তিকর উত্তর দেওয়া
ভুল উদাহরণ:
উত্তর ৫ মিনিট ধরে দেওয়া, যেখানে অর্ধেক তথ্যই অবান্তর।
সঠিক নয় কারণ:
প্রথম প্রশ্নে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর উত্তর ইন্টারভিউয়ের মনোযোগ হারাতে পারে। আদর্শ সময় ১–২ মিনিট।
5. চাকরির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলা
ভুল উদাহরণ:
“আমি শিক্ষক হতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু এখন সেলসের চাকরি করছি।“
সঠিক নয় কারণ:
আপনার উত্তর চাকরির পদের সাথে মিল থাকতে হবে। আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা যেন সংশ্লিষ্ট হয়।
6. মুখস্থ বা রোবটের মতো শোনানো উত্তর
ভুল উদাহরণ:
“My name is XYZ. I have done BBA. I am hard working, honest, punctual…”
সঠিক নয় কারণ:
এই ধরনের উত্তর মুখস্থ ও আবেগহীন লাগে। আপনার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ও স্বতঃস্ফূর্ততা থাকা জরুরি।
7. ভুল তথ্য দেওয়া বা অতিরঞ্জন করা
ইন্টারভিউতে ভুল তথ্য ধরা পড়লে আপনি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারেন। সবসময় সত্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিন।
স্মরণে রাখুন:
- আপনি কীভাবে নিজেকে প্রফেশনালভাবে উপস্থাপন করছেন, সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রশ্নের উত্তর যেন হয় সংক্ষিপ্ত, প্রাসঙ্গিক ও প্রফেশনাল।
- অনুশীলন করুন, কিন্তু মুখস্থভাবে নয় — যেন স্বাভাবিকভাবে বলতে পারেন।
উদাহরণ: “নিজেকে সম্পর্কে কিছু বলুন” – উত্তর নমুনা
ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটের জন্য:
“আমি রুবাইয়াত হোসেন, সদ্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (BBA) শেষ করেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিয়েছি এবং প্রেজেন্টেশন স্কিল ডেভেলপ করেছি। আমি আপনার প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ পোস্টের জন্য আবেদন করেছি কারণ আমি শিখতে আগ্রহী এবং টিমে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ।”
অভিজ্ঞ পেশাজীবীর জন্য:
“আমি ফারহানা সুলতানা, বর্তমানে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। আমার প্রায় ৮ বছরের অভিজ্ঞতা আছে মার্কেটিং ও কাস্টমার রিলেশন ম্যানেজমেন্টে। আমি সবসময় ডেটা-বেইজড ডিসিশন ও টিম কো-অর্ডিনেশনে বিশ্বাস করি। আপনার প্রতিষ্ঠানে এই পদে আমার দক্ষতা প্রয়োগ করে আরও ভ্যালু যোগ করতে পারব বলে মনে করি।”
আর ও উদাহারণ:
১. ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট/নতুন চাকরিপ্রার্থী:
“আমি তানিয়া রহমান, সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি ক্যারিয়ার ক্লাবের একটিভ সদস্য ছিলাম এবং বিভিন্ন প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছি। আমার আগ্রহ কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং–এ। আমি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাই যেখানে আমি শিখতে পারব এবং একসঙ্গে কোম্পানির সাফল্যে অবদান রাখতে পারব।“
২. আইটি/টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড:
“আমি জিয়াউর রহমান, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ৪ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি মূলত জাভাস্ক্রিপ্ট, নোড.জেএস এবং রিঅ্যাক্ট ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করি। বর্তমানে একটি স্টার্টআপে সিনিয়র ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছি। আমি এমন একটি চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা খুঁজছি যেখানে আমি প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে পারি এবং টিমের সঙ্গে উদ্ভাবনী প্রজেক্টে অবদান রাখতে পারি।“
৩. বিজনেস/মার্কেটিং প্রফেশনাল:
“আমি শাওন আহমেদ, গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন এফএমসিজি কোম্পানিতে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করেছি। আমার স্পেশাল স্কিল হলো কনজ্যুমার বিহেভিয়ার অ্যানালাইসিস ও মার্কেট রিসার্চ। আমি ক্রিয়েটিভ ক্যাম্পেইন ডিজাইন এবং কাস্টমার এনগেজমেন্টে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এখন আমি আরও বড় স্কেলে নেতৃত্ব দিতে চাই এবং ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টে ভূমিকা রাখতে চাই।“
৪. ব্যাক অফিস/অ্যাডমিন/এইচআর প্রফেশনাল:
“আমি মেহেদী হাসান, বর্তমানে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে কর্মরত। আমার কাজের মধ্যে অফিস ম্যানেজমেন্ট, স্টাফ কনফ্লিক্ট হ্যান্ডলিং, এবং ডকুমেন্ট কন্ট্রোল অন্তর্ভুক্ত। আমি বিশ্বাস করি, সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে শক্তিশালী করে। আমি চাই এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যেখানে আমার দক্ষতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে।“
৫. ব্যাংক/ফাইন্যান্স ব্যাকগ্রাউন্ড:
“আমি সুমাইয়া তাসনিম, ৬ বছর ধরে ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করছি। বর্তমানে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ক্রেডিট অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। কর্পোরেট লোন, রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, এবং ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপে আমার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি এমন একটি পরিবেশ খুঁজছি যেখানে আমি লিডারশিপ নিতে পারি এবং ইনোভেটিভ ফিনান্সিয়াল সল্যুশন নিয়ে কাজ করতে পারি।“
৬. শিক্ষক/শিক্ষিকা/একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড:
“আমি মুনতাসিরা ইসলাম, ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছি এবং গত ৩ বছর ধরে একটি বেসরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে কাজ করছি। আমার শিক্ষাদান কৌশল ইন্টার্যাক্টিভ ও ছাত্র–কেন্দ্রিক। আমি নিয়মিত ছাত্রদের ইংরেজি বিতর্ক ও ক্রিয়েটিভ রাইটিং ক্লাস করিয়ে থাকি। আমার লক্ষ্য একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের মাঝে আলো ছড়ানো।“
৭. সরকারী চাকরিপ্রার্থী (BCS/Bank Job):
“আমি আরিফুল ইসলাম, সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং এরইমধ্যে ব্যাংক ও BCS প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়েছি। আমি অর্থনীতি বিষয়ে মাস্টার্স করেছি এবং অ্যানালিটিক্যাল থিংকিং ও পাবলিক পলিসি নিয়ে আগ্রহী। আমি এমন একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করতে চাই যেখানে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যায় এবং নিজের জ্ঞান কাজে লাগানো যায়।“
উপসংহার
“নিজেকে সম্পর্কে বলুন” প্রশ্নটি শুধু একটি ভূমিকা নয় — এটি আপনার আত্মবিশ্বাস, প্রফেশনালিজম ও কমিউনিকেশন স্কিল প্রকাশের সুযোগ।
একটি স্পষ্ট, আত্মবিশ্বাসী এবং পদের সঙ্গে সংযুক্ত উত্তর ইন্টারভিউয়ের শুরুতেই আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।
SEO কীওয়ার্ড:
ইন্টারভিউ প্রস্তুতি বাংলা, ইন্টারভিউ প্রশ্ন উত্তর, নিজেকে সম্পর্কে বলুন, চাকরির ইন্টারভিউ গাইড, চাকরির প্রস্তুতি বাংলা, ইন্টারভিউ প্রশ্ন ও উত্তর